মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি ২০ দিনেরও বেশি সময় ধরে কার্যত বন্ধ থাকায় এ অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তবে এ পরিস্থিতি কেবল সাময়িক নয়, বরং মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে জ্বালানি তেলের এ চড়া দাম ২০২৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। খবর সিএনএন।
গোল্ডম্যান স্যাকস বৃহস্পতিবার এক নোটে জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হওয়ায় জ্বালানি তেলের বাজারদর তিন অংকেই আটকে থাকার ঝুঁকি বাড়ছে। যদি এ অচলাবস্থা আরো দীর্ঘ হয়, তবে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার আদর্শ ব্রেন্টের দাম ২০০৮ সালের রেকর্ড সর্বোচ্চ ১৪৭ ডলারও ছাড়িয়ে যেতে পারে। ব্যাংকটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে ২০২৭ সালের চতুর্থ প্রান্তিক (অক্টোবর-ডিসেম্বর) নাগাদ জ্বালানি পণ্যটির দাম ব্যারেলপ্রতি ১১১ ডলারে স্থিতিশীল থাকতে পারে।
যুদ্ধের কারণে চলমান সংকটের মূলে রয়েছে ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী সংকীর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল সরবরাহের ২০ শতাংশ এ পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। গত ২০ দিনেরও বেশি সময় ধরে এ প্রণালি বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
ইরানের এক ঊর্ধ্বতন নিরাপত্তা কর্মকর্তা সিএনএনকে জানিয়েছেন, এ প্রণালি আর কখনই যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরবে না। একই সঙ্গে কাতারের রাস লাফান গ্যাস কেন্দ্রে হামলায় দেশটির তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রফতানি সক্ষমতা ১৭ শতাংশ কমেছে। কাতারএনার্জি জানিয়েছে, এ বিশাল অবকাঠামো মেরামত করতে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে, যা এশিয়া ও ইউরোপের বাজারে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে।
এদিকে, জ্বালানি তেলের এ লাগামহীন দাম নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে গ্যাসোলিনের গড় মূল্য গ্যালনপ্রতি ৩ ডলার ৯১ সেন্টে দাঁড়িয়েছে, যা গত আড়াই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সিভুক্ত (আইইএ) ৩২টি সদস্য দেশ সম্মিলিতভাবে ১৭ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল সংরক্ষিত জ্বালানি তেল বাজারে ছাড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, এ সংকট দ্রুতই মিটে যাবে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে সক্রিয় যুদ্ধ চলায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করার বিষয়ে মার্কিন মিত্র দেশগুলো সরাসরি সামরিক সহায়তা দিতে এখনো দ্বিধাগ্রস্ত।
গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষণে একটি তুলনামূলক স্বস্তির চিত্রও উঠে এসেছে। যদি আগামী এপ্রিল থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি তেল সরবরাহ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করে, তবে ২০২৬ সালের শেষ প্রান্তিকে ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলারের ঘরে নেমে আসতে পারে। কিন্তু বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা ও চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি বিবেচনায় এ সম্ভাবনা বেশ ক্ষীণ বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, ইসরায়েল ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলায় জ্বালানি অবকাঠামোর যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। ফলে বিশ্ব অর্থনীতিকে হয়তো আরো বেশ কয়েক বছর জ্বালানি তেলের এ চড়া দামের ধাক্কা সামলাতে হবে।